আজকের লিখাটি একটু বড়, তবে লিখাটি পড়লে বাংলা ব্যাকরণ সম্পর্কে আপনার ধারণাই বদলে যাবে। ব্যাকরণ যে শুধু মুখস্থের বিষয় নয়, বরং এটি বুঝার বিষয় আজ তা হাতে-কলমে বুঝিয়ে দিব ইনশাআল্লাহ। আর হ্যাঁ, আজকের লিখাটি সর্বোচ্চ শেয়ার চাই। ব্যাকরণকে যে সহজ ভাষায় যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় তা সকলের কাছে ছড়িয়ে দিতে শেয়ার করতে ভুলবেন না।
প্রায় পরীক্ষায়
শব্দগঠন
থেকে এক ধরনের প্রশ্ন এসে থাকে—উদাহরণসরূপ ১টি বিসিএস পরীক্ষার, ১টি নিয়োগ পরীক্ষার আর ১টি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন নিম্নে দেওয়া হলো—১। ‘নবান্ন’ শব্দটি কোন প্রক্রিয়ায় গঠিত?
ক. সমাস খ. সন্ধি গ. প্রত্যয় গ. উপসর্গ
২। ‘বিদ্যালয়’ শব্দটি কীভাবে গঠিত?
ক. উপসর্গ খ. প্রত্যয় গ. সমাস ঘ. সন্ধি
৩। ‘পুষ্পাঞ্জলি’ শব্দটি কীভাবে গঠিত?
ক. প্রত্যয় যোগে খ. সন্ধি যোগে গ. উপসর্গ যোগে ঘ. সমাস যোগে
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রায় ভুল করে কারণ যে সন্ধি জানে সে সন্ধি উত্তর করে, আর যে সমাস জানে সে সমাস উত্তর করে, আর যে সন্ধি ও সমাস দুটিই জানে সে কী উত্তর করবে? প্রায় বইয়ে দেখা যায় উত্তর দুটিই (সমাস ও সন্ধি) দিয়ে রাখে; তাঁদের মতবাদানুযায়ী বোঝা যায়, প্রশ্নে ভুল আছে। আচ্ছা খেয়াল করুন তো, আমি কেবল উদাহরণসরূপ মাত্র ৩টি প্রশ্ন দিয়েছি, কিন্তু আপনি বিগত আসা প্রশ্নগুলি পড়লে দেখবেন এই ধরনের আরো প্রশ্ন আছে। তাহলে আপনার কী মনে হয় প্রশ্নে বারবার ভুল দিবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান? অবশ্যই না!
এই বিষয়ে সুস্পষ্ট উত্তর করতে হলে আপনাকে শব্দের গঠন সম্পর্কে কিছু বেসিক ধারণা রাখতে হবে।
শব্দগঠন: অর্থপূর্ণ ধ্বনিসমষ্টির দ্বারা শব্দ গঠন হয়। অর্থহীন কোনো ধ্বনি শব্দ হয় না; কারণ তা মানুষের বোধগম্য নয়। শব্দের অর্থ — বৈচিত্র্যের জন্যে নানাভাবে তার রূপান্তর সাধিত হয়। এভাবে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার-উপযোগী করে তোলার জন্যে শব্দ তৈরি করার প্রক্রিয়াকে শব্দগঠন বলে। ব্যাকরণগতভাবে, শব্দগঠন প্রধানত তিনটি উপায়ে হয়ে থাকে।
- উপসর্গের সাহায্যে
- প্রত্যয়ের সাহায্যে
- সমাসের সাহায্যে
এছাড়াও সন্ধি, বিভক্তি, পদ পরিবর্তন, দ্বিরুক্তি, বহুবচন ও বাক্য সংকোচনের মাধ্যমে বাংলা শব্দ সাধিত হয়। আর এই উপায়গুলি শব্দগঠনে অপ্রধান মাধ্যম।
এবার আসা যাক প্রশ্নোত্তর প্রসঙ্গে—
→ ‘নবান্ন’ শব্দটি কোন প্রক্রিয়ায় গঠিত?
ক. সমাস খ. সন্ধি গ. প্রত্যয় গ. উপসর্গ
ব্যাখ্যা ও উত্তর: নতুন (নব) ধানের অন্ন = নবান্ন। এখানে, নবান্ন শব্দটি দ্বারা 'নব' বা 'অন্ন' কাউকে না বুঝিয়ে একটি উৎসব কে বুঝাচ্ছে। হেমন্ত ঋতুতে ধান কাটার পর অগ্রহায়ণ মাসে পালিত একটি অনুষ্ঠান। তাই এটি বহুব্রীহি সমাস। 'নতুন'- বিশেষণ এবং 'অন্ন' বিশেষ্য হওয়ায় এটি সমানাধিকরণ বহুব্রীহি। সুতরাং ‘নবান্ন’ শব্দটি সমাসের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। আবার, সমাসের মাধ্যমে গঠিত শব্দগুলোর প্রায় শব্দের সন্ধি-বিচ্ছেদ করা যায়। এখানে, নব + অন্ন = নবান্ন (স্বরসন্ধি)। এখন প্রশ্ন হচ্ছে উত্তর করবেন কোনটি? সমাস নাকি সন্ধি?
লক্ষ করুন, শব্দ গঠনের প্রধান ৩টি উপায়ের মধ্যে সন্ধি নেই তবে সেই ৩টি উপায়ের মধ্যে সমস একটি উপায়। তাহলে অবশ্যই সমাস উত্তর হবে। সন্ধি হবে না। আর এই প্রশ্নের উত্তরে সমাস অপশনটি না থাকলে তখন সন্ধি উত্তর হত।
সমাস-সন্ধি নিয়ে আমার ব্যক্তিগত একটি মতমতা দিচ্ছি।
আমরা এখন যত সংক্ষিপ্তাকারে ভাষা প্রকাশ করি, অনেক বছরে আগে এতটা সংক্ষিপ্তাকারে ভাষা প্রকাশ করা যেত না; অনেক বিস্তারিত প্রকাশ করতে হতো। যেমন— আমরা এখন বলি বিদ্যালয় কিন্তু আগে বলা হতো ‘বিদ্যার নিমিত্তে আলয়’। বাক্যাকারে— এই তুই বিদ্যার নিমিত্তে আলয়ে যাবি না? আর এখন বলি— এই তুই বিদ্যালয়ে যাবি না? তার মানে ভাষার আধুনিকতার ফলে ব্যাকরণিকভাবে সমাসের কারণে একাধিক পদকে একপদে ‘বিদ্যালয়’ পরিণত হয়েছে। আর অবশিষ্ঠ ‘সমস্তপদটিকে (বিদ্যালয়) সন্ধির ফলে (বিদ্যা + আলয়) পেয়েছি। এরূপ অনেক উদাহরণ-ই আছে। তাই ভাষায় ব্যাকরণিকভাবে সমাস-সন্ধির মধ্যে প্রথমে অগ্রাধিকার রেখেছে সমাস তারপর সন্ধি। তাই সবসময় উত্তর হবে সমাস। আশা করি বুঝতে পেরেছেন।
এবার আসা যাক দ্বিতীয় প্রশ্নটিতে—
→ ‘বিদ্যালয়’ শব্দটি কীভাবে গঠিত?
ক. উপসর্গ খ. প্রত্যয় গ. সমাস ঘ. সন্ধি
ব্যাখ্যা ও উত্তর: প্রথম প্রশ্নে ব্যাখ্যানুসারে ‘বিদ্যালয়’ শব্দটি উপসর্গ কিংবা প্রত্যয় সাধিত শব্দ নয়। কিন্তু সমাম বা সন্ধি সাধিত শব্দ। বিদ্যার নিমিত্তে আলয় = বিদ্যালয় (৪র্তী তৎপুরুষ সমাস)। আবার, বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয় (স্বরসন্ধি)। তাহলে উত্তর হবে অবশ্যই সমাস।
এবার আসা যাক তৃতীয় প্রশ্নটিতে—
→ ‘পুষ্পাঞ্জলি’ শব্দটি কীভাবে গঠিত?
ক. প্রত্যয় যোগে খ. সন্ধি যোগে গ. উপসর্গ যোগে ঘ. সমাস যোগে
ব্যাখ্যা ও উত্তর: আপনারা ভাবছেন, এই প্রশ্নের উত্তরও সমাস যোগে হবে। কিন্তু না। আনুন দেখি উত্তর কী হয়। পুষ্প + অঞ্জলি = পুষ্পাঞ্জলি (তদ্ধিত প্রত্যয়); পুষ্পের অঞ্জলি = পুষ্পাঞ্জলি (তৎপুরুষ সমাস); পুষ্প + অঞ্জলি = পুষ্পাঞ্জলি (স্বরসন্ধি)। এখন উত্তর করার সময় লক্ষ রাখতে হবে, উপরের শব্দ গঠনের ধারাবাহিকতা [উপসর্গ> প্রত্যয় > সমাস > সন্ধি]। তাহলে পুষ্পাঞ্জলি শব্দের উত্তর হবে প্রত্যয় সাধিত শব্দ।
আরেকটি নতুন প্রশ্ন দিচ্ছি— ‘নিরামিষ’ শব্দটি কী সাধিত শব্দ?
ব্যাখ্যা ও উত্তর: নির + আমিষ = নিরামিষ (তৎসম উপসর্গ যোগে); আমিষের অভাব = নিরামিষ (অব্যয়ীভাব সমাস যোগে); নিঃ + আমিষ = নিরামিষ (বিসর্গ সন্ধি যোগে)। তাহলে উত্তর হবে উপসর্গ কারণ শব্দ গঠনে প্রথম ধাপ উপসর্গ আর যেহেতু এটি উসর্গ সাধিত শব্দ তাই উত্তর উসর্গ যোগে হবে।
আরো সহজ করে বলছি,
→ ‘সন্ধি’ শব্দটি কী সাধিত শব্দ? এই প্রশ্নটি প্রায় পরীক্ষায় এসেছে। সম্+ধা+ই = সন্ধি (প্রত্যয় সাধিত)। আবার, সম্ + ধি (ব্যঞ্জন সন্ধি)। লক্ষ করুন তো, আমরা কখনও বলি ‘সন্ধি’ শব্দটি সন্ধি সাধিত শব্দ? অব্যশই না। আমরা বলি, ‘সন্ধি’ শব্দটি প্রত্যয় সাধিত শব্দ। এবার মনে হয়, আপনার কাছে উপরের সকল ব্যাখ্যা বোধগম্য হয়েছে।
Tags
টিপস