জাপান দেশ পরিচিতি - সূর্যোদয়ের দেশ জাপান - জাপানের আয়তন, রাজধানী, সরকার ব্যবস্থা, সংবিধান ইত্যাদি - বিশ্ব পরিচিতি

দেশ পরিচিতি - সূর্যোদয়ের দেশ জাপান

দেশ পরিচিতি - সূর্যোদয়ের দেশ জাপান


সূর্যোদয়ের দেশ জাপান পূর্ব এশিয়ার সর্বাধুনিক রাষ্ট্র। প্রায় ছোট বড় ৩০০০ দ্বীপের সমন্বয়ে এ দেশটি গঠিত। টোকিও জাপানের বৃহত্তম শহর ও রাজধানী। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি টোকিওতে প্রায় ৯০ লাখ লোকের বাস। টোকিও ছাড়াও অন্যান্য শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে ইযুমো, ইয়োকোহামা, সাপ্পোরো প্রভৃতি।
ভৌগোলিক অবস্থার দরণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় মেখলায় অবস্থিত হওয়ায় দেশটি প্রায়ই ভূমিকম্প ও সুনামির মতো চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর ‍শিকার হয়। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে জাপানই কেবল সর্বোচ্চ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দেশ।
শুরুতে ১২শ শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত শোগুন নামক এক শ্রেণীর শাসক শ্রেণী জাপান শাসন করতেন। দীর্ঘদিন গৃহযুদ্ধের পর ১৮৬৮ সালে মেইজি সম্রাট ক্ষমতায় এলে জাপান পুন:প্রতিষ্ঠা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানী ও আমেরিকার বিরুদ্ধে লিপ্ত হলে বিপত্তি বাঁধে। মার্কিন পারমাণবিক হামলার কারণে দেশটির হিরোশীমা ও নাগাসাকি শহর ধ্বসস্তুপে পরিণত।
এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে জাপানীরা আর যুদ্ধে লিপ্ত না হওয়ার ঘোষণা দেয়। এর প্রায় দুই দশকের মধ্যেই জাপান শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বর্তমানে বিশ্বে ধনী দেশের তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে জাপান। জাপান বিশ্বের ১০ম জনবহুল দেশ, এর বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৯ লাখ।
জাপানের প্রধান দুইটি ধর্ম হলো শিন্তো ও বৌদ্ধ। বেশিরভাগ জাপানিরাই এই দুই ধর্মের অনুসারী। শিন্তো ধর্ম জাপানের প্রাচীন ধর্ম। এছাড়াও জাপানের আরো বেশ কয়েকটি নতুন ধর্মের ও প্রচলন রয়েছে। এছাড়াও জাপানে রয়েছে প্রায় ৩০ লাখ খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী।
জাপানের জাতীয় খেলা সুমো, জাপানই একমাত্র দেশ যেখানে প্রাচীন এ সুমো খেলা পেশাদারীভাবে খেলা হয়। তবে ফুটবলেও জাপান বেশ আত্নবিশ্বাসী দল।
ব্যতিক্রমধর্মী ও উন্নত প্রযুক্তির ক্রমাগত উদ্ভাবনের ফলে জাপান নিজেদের অর্থনৈতিক খাতকে করে তুলেছে সমৃদ্ধ। মোটকথা, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ সব দিকেই দেশটি বিশ্বখ্যাত।
অবশ্য জাপানের অধিবাসীরা এ সাফল্যের পেছনে তাদের কঠোর পরিশ্রমকেই প্রধান শক্তি হিসেবে বিশ্বাস করে। এমনকি কাজে এক মিনিট দেরি করাকেও তারা বড় ক্ষতি মনে করে। ছোটবেলা থেকেই দেশটির শিশুদের নিজের কাজ নিজে করা, নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে শিক্ষা দেওয়া হয়। এছাড়াও দেশটির সংস্কৃতি বিষয়ক শিক্ষাও শিশুরা ছোটকাল থেকেই পেয়ে থাকে। জাপানের শিশুরা অন্য দেশের শিশুদের তুলনায় মেধায় অনেক এগিয়ে।
জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থাও অনেক উন্নত। এজন্য প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ বিদেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী জাপানে পাড়ি জমায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকেও পিছিয়ে নেই জাপান। জাপানের নাগাসাকি অঞ্চলের কিউশু দ্বীপে অবস্থিত খ্রিষ্টান চর্চা কেন্দ্রটিকে এবার ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দিয়েছে।
পর্যটন শিল্পেও জাপান অনেক এগিয়ে, পর্যটকদের প্রতি দেশটির বন্ধুসুলভ আচরণ দেশটি পর্যটন শিল্পকে উন্নত করে তুলেছে। সূর্যোদয় ছাড়াও দেশটিতে দেখার মতো রয়েছে হিমেজি প্রাসাদ, ফিনিক্স হল, কোয়াচি ফুজি গার্ডেন, হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্কসহ আরো অনেক দর্শনীয় স্থান।
মজার বিষয় হলো, জাপানে কোনো ডাস্টবিন নেই। জাপানিরা সব ধরনের বর্জ্য রিসাইকেল করার চেষ্টা করে। তবে যেগুলো সম্ভব নয়, সেগুলো সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেলা হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে জাপানীরা অত্যন্ত সচেতন।
এখানে সরকারব্যবস্থা ইউনিটারি সংসদীয় সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। রাষ্ট্র প্রধানের পদবী হচ্ছে সম্রাট। তিনি একইসাথে ইম্পেরিয়াল পরিবারের প্রধান। বর্তমান সম্রাট এর নাম হচ্ছে নুরুহিত। পূর্ববর্তী সম্রাট আখিহিত এর বড় ছেলে এবং তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
প্রধানমন্ত্রী হচ্ছে সরকার প্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নাম হচ্ছে শিনজো অ্যাবে। উল্লেখ্য যে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সামান্য কোন অভিযোগ বা দায়িত্ব অবহেলার কারণে পদত্যাগ করে। যেই কারণে বেশিরভাগ প্রধানমন্ত্রী এক বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারে না।
জাপানের আইন সভার নাম হচ্ছে ন্যাশনাল ডায়েট। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার উচ্চকক্ষের নাম হচ্ছে হাউজ অফ কাউন্সিলরস এবং নিম্নকক্ষের নাম হচ্ছে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস।
জাপানের রাজধানী এবং সর্ববৃহৎ নগরী হচ্ছে টোকিও। যা বিশ্বের সবথেকে জনবহুল মেট্রোপলিটন এলাকা এবং একই সাথে বিশ্বের বৃহত্তম নগর অর্থনীতির শহর। প্রায় চার কোটি মানুষ বাস করে এই মেট্রোপলিস এ। এই শহরকে ধরা হয় আলফা প্লাস বা ওয়ার্ল্ড সিটি বা গ্লোবাল সিটি।
মাত্র কয়েকটি উন্নত বিশ্বের মধ্যে জাপানেও রাস্তার বাম দিক থেকে গাড়ি চালানো হয়। এই তালিকায় রয়েছেন নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য।
জাপানের মোট আয়তন ৩.৭৮ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এবং লোকসংখ্যা ১২.৬ কোটি। যা বিশ্বের এগারতম জনবহুল রাষ্ট্র। এখানকার ৯০ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করে থাকে।
জাপানের ইন্টারনেট ডোমেইন কোড ডট জেপি এবং কলিং কোড +৮১
পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের নাম হচ্ছে জাপান এয়ারলাইন্স। এখানে সর্ববৃহৎ বিমান বন্দরের নাম হচ্ছে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। অন্যদিকে, সবথেকে বড় এবং ব্যস্ততম সমুদ্র বন্দর হচ্ছে নাগোয়া পোর্ট।
জাপান সরকারের অফিশিয়াল উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি বা জাইকা। যারা উন্নয়নশীল দেশে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে থাকে। জাইকা বাংলাদেশের সবথেকে বেশি দাতা। যে কারণে বাংলাদেশের সব থেকে বড় দাতা দেশ হচ্ছে জাপান এবং ধরে নেয়া হয় বাংলাদেশের পরম বন্ধু রাষ্ট্র হচ্ছে জাপান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন