পথের পাঁচালী বুক রিভিউ
বইয়ের নাম : পথের পাঁচালী
লেখকের নাম : বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়
ধরণ : পারিবারিক কাহিনী নির্ভর ও বিয়োগাত্নক।
রেটিং : ১০/১০ (বিভূতীভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের মত এমন প্রথিতযশা লেখকের বইয়ের রেটিং করার দুঃসাহস আমার নেই।তবুও প্রয়োজনের খাতিরে দিলাম।এটি আমার ব্যাক্তিগত অভিমত)

রিভিউ : উপন্যাস বলতে সাধারণত যে ধারণা
আমাদের মনে আসে পথের পাচাঁলী সে জাতের
উপন্যাস নয়,বরং উপন্যাসের গন্ডি ছাড়িয়ে এর
ব্যাপিতা আরো বহুদূর পর্যন্ত।উপন্যাসটির
গোড়াপত্তন সামাজিক চিত্র দিয়ে শুরু হয়েছে।দূর
অতীতের সাথে পল্লীবাংলার জীবনের গ্রামীণ
যোগ দিয়ে গল্প শুরু হয়েছে।এর বর্ননা
ধীর,কাহিনীতে চমক আনায় শিল্পীর কোন উত্সাহ
নেই।কিন্তু উপন্যাসের প্রতিটি বাক্যশৈলীর মধ্যে
প্রকৃতির অন্তর্নিহিত রসভান্ডার উন্মুক্ত করার
কাজে লেখকের মনযোগ ষোলআনা।আমাদের এই
চিরায়ত বাংলার আশা-আকাঙ্খা,নৈরাশ্য-বেদনার
ছবি সহ দারিদ্র্য লাঞ্জিত পল্লীগ্রামের বালক
বালিকার মনস্তত্ত্বের বিশ্লেষণ করতে তিনি
ছিলেন ব্যস্ত।ছবির পর ছবি এঁকে 'পথের পাঁচালী' কে
তিনি চিত্রশালা হিসেবে গড়ে তুলেছেন।গৃহস্থা
লি,পল্লীপথ,বনবাদাড়,মাঠঘাট,নদী-প্রান্তর,পশু-পাখী ,পূজা-পার্বন প্রভৃতির ছবির সাথে ধীরে ধীরে
করুণ রস নিসিক্ত কাহিনী এগিয়ে চলেছে।
এ উপন্যাসের মূল চরিত্র অপু।প্রকৃতির কোলে অপু মানুষ
হয়ে উঠেছে,প্রকৃতির সাথে তার নাড়ির সংযোগ।
আমি যতবার উপন্যাস টি পড়েছি,ততবারই অপু আর
কেউ নয়,স্বয়ং আমি হয়ে আমার সামনে প্রতীয়মান
হয়েছে।লেখক অপুর ছেলেবেলা কে এমন ভাবেই
উপস্থাপন করেছেন যা যে কারো মন মুগ্ধ করার
যোগ্যতা রাখে।কিশোর অপুর জানার আগ্রহ মন কে
চঞ্চল করে তোলে বার বার।কিশোর অপু চলার পথের
দুধারের দৃশ্যকে দুচোখ ভরে দেখতে চায়।প্রকৃতির
প্রতি অপূর্ব আকর্ষণ অপুকে করেছে নিসর্গ
মনস্ক।অপর দিকে সে সংকোচ-লাজুক।এই বইটির
অসাধারণ বণর্না আমাকে স্বপ্নের জগতে নিয়ে
গেছে।রাংচিতা,গুড়কলমী,মাকাল,ঘেঁ
টু,সোঁদালী,নেবু ফুলের মিষ্টি গন্ধ,গ্রাম্য বধূর ভিজে
পায়ের ছাপ,কাশবন,পদ্মফুলে ভরা ঝিল আমাকে
প্রচন্ড ভাবে মুগ্ধ করেছে।এই বইয়ের অন্য চরিত্র
গুলোও অনন্য অসাধারণ।৭৫বছরের ইন্দির ঠাকুরণের
কথা পড়তে গিয়ে আমার চোখে ভেসে উঠেছে বয়সের
ভারে নত এক বৃদ্ধার ছবি।সর্বজয়ার চরিত্র যেন
আমারই নিজের মায়ের প্রতিচ্ছবি।অপুর বোন দূর্গা
আমার কাছে বিশেষ মহিমায় হাজির হয়েছে।বইটি
পড়লে মনে হয় অপু ছাড়া দূর্গা কিংবা দূর্গা ছাড়া
অপু অর্থহীন।দূর্গার হাত ধরেই অপুর প্রকৃতিতে
পদার্পন।দূর্গার খেলা,ঝগড়া,চুরি,দূরন্তপনার মত
দূর্নিবার জীবনীশক্তিময় অন্য কোন চরিত্র বাংলা
সাহিত্যে নেই।আর তাই দূর্গার মৃত্যু আমাকে প্রবল
ভাবে নাড়া দিয়েছিল।দূর্গার প্রতি অপুর প্রেম
একটি বাক্যেই তীব্র ভাবে ফুটে উঠেছে,
"আমি যাইনি দিদি,আমি তোমাকে ভুলিনি,ইচ্ছে
করে ফেলে আসিনি,ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে।"
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় অসামান্য দক্ষতায় নিখুঁত
ভাবে এ উপন্যাস রচনা করেছেন।এ পর্যন্ত পড়া সকল
ধরনেই বইয়ের মধ্যে এটিই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ বই।
উদ্ধৃতি :
১. ডঃ সৌমিত্র শেখর___
”বিভূতিভূষণ
দরিদ্র চরিত্রগুলোর সমাবেশ ঘটিয়ে কোন দুঃখগাঁথা
তৈরি করতে চান নি। অথবা চান নি
প্রলেতারিয়েতের শ্রেণি বিপ্লব ঘটাতে। তিনি
যুগের অস্থিরতায় না জড়িয়ে আবহমানকালের
চিরস্থায়ী, চিরসাক্ষী এবং একটি পরিপূর্ণ সত্ত্বা
নিসর্গ প্রকৃতিকে অবলম্বন করলেন এ উপন্যাসে।”
২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর____
‘বইখানা দাঁড়িয়ে আছে আপন
সত্যের জোরে।’
লেখক পরিচিত : বিভূতিভূষণ বাংলা সাহিত্যের
একজন জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক।তিনি ১২ই সেপ্টেম্বর, ১৮৯৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪
পরগণা জেলার
কাঁচরাপাড়ার নিকটবর্তী ঘোষপাড়া-সুরারিপুর
গ্রামে নিজ মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।
তার পৈতৃক নিবাস উত্তর ২৪ পরগণা জেলার
বারাকপুর গ্রাম।
পথের পাঁচালী ও অপরাজিত তাঁর সবচেয়ে বেশি
পরিচিত উপন্যাস। অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে
আরণ্যক , আদর্শ হিন্দু হোটেল , ইছামতী ও অশনি
সংকেত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উপন্যাসের
পাশাপাশি বিভূতিভূষণ প্রায় ২০টি গল্পগ্রন্থ,
কয়েকটি কিশোরপাঠ্য উপন্যাস ও কয়েকটি
ভ্রমণকাহিনি এবং দিনলিপিও রচনা করেন।
বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী উপন্যাস অবলম্বনে
সত্যজিৎ রায় পরিচালিত চলচ্চিত্রটি
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। ১৯৫১ সালে ইছামতী
উপন্যাসের জন্য বিভূতিভূষণ পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ
সাহিত্য পুরস্কার রবীন্দ্র পুরস্কার (মরণোত্তর)
লাভ করেন।
১লা নভেম্বর , ১৯৫০ সালে তিনি মারা যান।
প্রকাশ কাল : পথের পাঁচালী
প্রথমে ধারাবাহিকভাবে বের হয়েছিল মাসিকপত্র
‘বিচিত্রা’য়। এক বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল এতে।
বই আকারে এটি বের হয় ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে, ১৩৩৬
বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে।সজনীকান্ত দাস রঞ্জন
প্রকাশলয় থেকে এটি প্রথম বের করেন।
অধ্যায় : বইটি ৩ভাগে বিভক্ত।
১. বল্লালী - বালাই
২.আম আটির ভেঁপু
৩.অক্রুর সংবাদ
পৃষ্টা সংখ্যা : বিভিন্ন বইতে আলাদা আলাদা।
আমার কাছে থাকা বইটিতে ২১৫টি।
মূল্য : ২০০টাকা (আমার বই অনুসারে)
প্রাপ্তিস্থান : বাংলাদেশের যে কোন
লাইব্রেরীতে পাওয়া যায়।
অনলাইন প্রাপ্তিস্থান : http://www.rokomari.com/book/30465
ব্যাক্তিগত মতামত : বইটি প্রথম পড়েছিলাম সপ্তম
শ্রেণীতে থাকা অবস্থায়।তখনই প্রচন্ড ভাল
লেগেছিল।পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
বাংলা সাহিত্যে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম বর্ষে
পাঠ্যবই হিসেবে পেয়েছিলাম।সেসময় বইটি নিয়ে
যতই থিসিস করেছি ততই মুগ্ধ হয়েছি।জীবনে অনেক
বই পড়েছি,আরো হয়ত পড়বো,অনেক বই হয়ত মন ছুঁয়ে
যাবে।কিন্তু পথের পাচাঁলী যে বিশেষ স্থানে
আছে,কখনো তার স্থানচুত্যি ঘটবে না
Tags
বুক রিভিউ